দুর্ব্বাসার পারণ

শ্রীঅন্নদাঠাকুর || প্রকাশ কাল - March 6 2018


একদিন শ্রীমতী রাধারাণী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে ধ্যানস্থ অবস্থায় দর্শন করিয়া একটু আশ্চর্য্যান্বিত হইয়া ধ্যানান্তে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘প্রাণবল্লভ! আজ আমাকে একটি সত্য কথা বলতে হবে। বল – আমি যা জিজ্ঞেস কর্‌ব, তার যথার্থ উত্তর দেবে’?
রসরাজ হাসিয়া বলিলেন, ‘সে কি? তোমার কথার যথার্থ উত্তর দেব না? বল প্রিয়ে! তোমার কি কথা আছে?’
তখন শ্রীমতী বলিলেন, ‘তুমি আজ ধ্যানস্থ অবস্থায় কি চিন্তা করছিলে আমায় বলতে হবে; ঐ কথা জানবার জন্য আমার মন বড়ই উদ্বিগ্ন হয়েছে।’
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, ‘রাধে! আমি শয়নে স্বপনে নিশি জাগরণে তোমাকে ছাড়া আর যে কিছুই চিন্তা করি না, তা কি তুমি জান না? আমার নয়ণের মণি, প্রাণের প্রাণ, জীবনের জীবন, তুমি ছাড়া আর কি আছে প্রিয়ে?
শ্রীমতী কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত না করিয়া বলিলেন; ‘ওহে শঠশিরোমণি! আমি তা শুন্‌তে চাই নি; তোমার যে আমিই সব, তা আর আমার জান্‌তে বাকী নেই। তা যদি না হবে ত দিবানিশি এমন করে তোমার জ্বালায় জ্বলব কেন? আর তা না হলে, তুমিই বা আজ এর দ্বারে, কাল ওর কুঞ্জে – কখনও বৃন্দার আসরে, কখনও কুব্জার বাসরে আসা যাওয়া কর্‌বে কেন? তোমায় কি আর আমার চিন্‌তে বাকী আছে প্রভু? – তুমি ভাব এক, কর আর; দেখাও যেন চমৎকা! তোমার গুণের কি অন্ত আছে? – এখন ওসব কপটাচরণ ছেড়ে সত্য কথা বল দেখি – ধ্যান মনে কি ভাব্‌ছিলে?
শ্রীরাধার ভাব বুঝিয়া শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, ‘প্রিয়ে! আজ আমি ভক্ত দুর্ব্বাসার কথা ভাবছিলাম। দুর্ব্বাসা আজ একাদশীর উপবাস করে কঠোর তপস্যায় মগ্ন; তাই আমি ধ্যানে তাকে দেখ্‌ছিলাম। তুমিত জান ভক্তের জন্য আমি কি না করি।’
কথা শুনিয়া শ্রীমতী একটু হাসিয়া বলিলেন, ‘তা হতে পারে; তুমি যে তোমার ভক্তের জন্য নিজেকেও বিকিয়ে দিতে পার, তা আমি একশবার স্বীকার কর্‌ব। আচ্ছা, তাই যদি হয়, ভক্তকে যদি তুমি এতই ভালবাস, ত দুর্ব্বাসার এ দুঃখ দেখে তোমার দয়া হচ্ছে না কেন? দুর্ব্বাঘাসের দুখানা রুটি মাত্র যার আহার, তার যে একাদশী কোন দিন নয়, তা ত আমি ভেবে পাই না। বেচারা না খেয়ে খেয়ে কি রূক্ষ প্রকৃতি যে হয়ে পড়েছে, তা ত তার যাবতীয় আচরণেই প্রাকাশ পায়। তুমি এদিকে এত দয়াল, এত প্রেমিক, এত ভক্তবৎসল; আবার এমন কঠোর, কপট, ক্রুর যে তোমায় চেনা দায়! তোমায় বোঝে কার সাধ্য? দুর্ব্বাসা যদি আমার ভক্ত হত, ত দেখ্‌তে আমি তাকে কেমন দুধ ক্ষীর ছানা ননী – চর্ব্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় কত কি খাইয়ে তার মাথা ঠান্ডা রাখ্‌তুম; অমন বদমেজাজী হতে দিতুম না। সত্যই ওরকম অস্থিচর্ম্মসার যোগী দেখে আমা দুঃখও হয় – ভয়ও হয়।’
কথা শুনিয়া শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, ‘রাধে! তুমি বুদ্ধিমতী হয়ে এসব কি বল্‌ছ? যোগীরা কি ভোগী হয়? – না ভোগ্য বস্তুর অভাবে তাদের কোন গুণের লাঘব হয়? যে যে প্রকৃতির যোগী সে সেই প্রকৃতি নিয়েই থাক্‌বে; হাজার ছানা ননী খাওয়ালেও তার প্রকৃতির পরিবর্ত্তন হবে না। দুর্ব্বাসা যে প্রকৃতির সাধক, তুমি সে রকম আর একটি খুঁজে পাবে না। তখন শ্রীমতী বলিলেন, সত্যই দুর্ব্বাসার দুঃখ দেখে আমার বুক ফেটে যায়। এত কঠোরতা না করে কি সাধন হয় না? ও রকম কঠোর যোগীদের কি তুমি বেশী ভালবাস?’
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, আমি কঠোরতা মোটেই ভালবাসি না; উপবাস করে যারা কঠোর ব্রত অবলম্বন করে, তারা প্রকৃত পক্ষে আমাকেই দুঃখ দেয়। তবে সে দুঃখ পেয়ে আমি তাদের উপর কুপিত হই না; — কেন জান? আমার জন্যই ত তাদের দুঃখ; এত কঠোরতা; এত ত্যাগ স্বীকার। তারা যদি জান্‌ত যে তাদের এই দুঃখে আমি দুঃখ পাই; তা হলে কি তারা অমন ব্রত গ্রহণ কর্‌ত? – কখনই নয়; তাই কষ্ট পেয়েও আমি তাদের সিদ্ধি দান করি। কিন্তু যারা ভক্ত তাদের জন্য আমার প্রাণ সর্ব্বদা উদ্বিগ্ন থাকে; — তারাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।’
শ্রীমতী বলিলেন, ‘এই ত একটু আগে তুমি বল্‌লে, — দুর্ব্বাসা তোমার ভক্ত; তুমি দুর্ব্বাসার জন্য ভাব্‌ছ; — আবার বল্‌ছ সে ভক্ত নয়; এ কেমন কথা?’
‘হাঁ প্রিয়ে! যোগীও ভক্ত, জ্ঞানীও ভক্ত, আবার ভক্তও ভক্ত; ভক্ত সবাইকেই বলে। তবে কেহ সাত্ত্বিক, কেহ রাজসিক, কেহ বা তামসিক। যারা শুধু আমায় ধ্যান করে, আমার পূজা ও আমার গুণগান নিয়ে থাকে – যখন যা করে সমস্ত আমাকে সমর্পণ করেই সন্তুষ্ট থাকে – তাদেরই ভগবৎভক্ত বলে; তারাই আমার প্রধান সাত্ত্বিক ভক্ত। আর যারা যোগাদি ব্রত পালন করে অণিমা লঘিমাদি অষ্টসিদ্ধিলাভের আশায় সাধন পথে অগ্রসর হয়, তারা মধ্যম শ্রেণীর বা রাজসিক ভক্ত। আর যারা বেদাদি অধ্যায়ন করে, মৌনাবলম্বন না করে পান্ডিত্যাদি দ্বারা বহু শিষ্য সেবক গ্রহণ মানসে সাধুবেশ ধারণ করে, তারা অধম বা তামসিক ভক্ত। প্রকৃত জ্ঞানী ভক্ত পৃথিবীতে অতি বিরল। যাঁরা প্রকৃত জ্ঞানী, তাঁরা মৌনী থাকেন; কারও সঙ্গে বাক্যালাপ করেন না। তাঁদের কর্ম্ম থাকে না; সকল কর্ম্মই ক্ষয় হয়। ভক্তির চরম অবস্থায় সেই জ্ঞান লাভ হয়। কেহ কেহ বলেন, ভক্তির চরম অবস্থাকেই জ্ঞান বলে। জন্ম জন্মান্তরের সাধনায় জীব সেই জ্ঞানের অধিকারী হয়।
এই কথায় শ্রীমতী মৃদু হাসিয়া বলিলেন, ‘তুমি জগৎস্বামী হয়ে তোমাতে এত ভেদ বুদ্ধি কেন? ছোট বড়, উত্তম মধ্যম, এসব বিচার কেন? – তুমি ত সবার হৃদয় জান? সবাই যে তোমাকে চায়, তা কি বুঝ্‌তে পার না? যে, যে পথেই যাক, তুমি ছাড়া অন্য লক্ষ্য ত নেই। তুমিই তে আনন্দময়।’
‘হাঁ প্রিয়ে! সত্য কথা; তবে কি জান? পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয় তাদের মধ্যে যেমন উত্তম মধ্যম অধম ভাবে শ্রেণী বিভাগ আছে, সেই রকম এই ভব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিবৃন্দের মধ্যেও গুণভেদে শ্রেণী ভেদ আছে। তা না থাকলে পরীক্ষার মর্য্যাদা থাকে না। আচ্ছা, তুমি এক কাজ কর; তাহলেই বিষয়বিরাগীর অবস্থা বেশ বুঝ্‌তে পারবে। কাল দ্বাদশী; তুমি ভোরে গিয়ে চর্ব্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় করে দুর্ব্বাসাকে বেশ করে আহার করিয়ে এস। ভাল আহার্য্যের প্রতি দুর্ব্বাসার কেমন আগ্রহ তহলেই বুঝ্‌তে পারবে।’
প্রথমতঃ শ্রীমতী দুর্ব্বাসার নিকট যাইতে ঘোরতর অনিচ্ছা প্রকাশ করিলেন। পরে শ্রীকৃষ্ণ অনেক বুঝাইলে এবং অভয়দান করিলে যাইতে স্বীকৃত হইলেন। পরদিন প্রত্যুষে নানাবিধ আহার্য্য লইয়া শ্রীমতী যমুনাতীরে উপস্থিত হইলেন। কিন্তু একি! যমুনার কি ভীষণ উগ্র মূর্ত্তি! স্রোতের বেগ যেন সেদিন দ্বগুণ; তাহাতে তরঙ্গের উপর তরঙ্গ; এতদবস্থায় খেয়ার মাঝি কাহাকেও পার করিতে প্রস্তুত নয়। ব্যাপার দেখিয়া শ্রীমতী মনে মনে দুঃখিত হইলেন এবং কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় উপায়নির্দ্ধারণকল্পে পুনরায় কৃষ্ণসকাশে প্রত্যাগমন করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতীকে ভগ্নোৎসাহ হইতে নিষেধ করিয়া বলিলেন, ‘প্রিয়ে! তুমি যাও; গিয়ে যমুনাকে বল – আমার শ্রীকৃষ্ণ যদি কখনও কোন স্ত্রীলোককে স্পর্শ না করে থাকেন, তাহলে আমায় যেতে পথ দাও।’
এই কথায় শ্রীমতী সবিস্ময়ে শ্রীকৃষ্ণের মুখপানে চাহিয়া যখন বুঝিলেন, শ্রীকৃষ্ণ চাতুরী করিতেছেন না; তখন ধীরপদক্ষেপে পুনরায় যমুনাতীরে আসিয়া উপনীত হইলেন; এবং শ্রীকৃষ্ণের উক্তি যমুনাকে শুনাইয়া দেখেলন, অবিলম্বে যমুনা শান্তভাব ধারণ করিয়া পথ দিলেন। শ্রীমতী বিস্মিত কৌতুহলে যমুনা পার হইয়া দুর্ব্বাসা মুনির আশ্রমে গিয়া উপস্থিত হইলেন। মুনিবরের তখনও পারণ হয় নাই। শ্রীমতী করজোড়ে তাঁহাকে পারণ করাইবার বাসনা জানাইলেন। দুর্ব্বাসা ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন, ‘আপানার বাসনা পূর্ণ হবে। কিন্তু প্রতিজ্ঞা করুন, এই রূপ নিয়ে আপনি আর কোন মুনি ঋষির আশ্রমে যাবেন না। যে রূপমদিরায় স্বয়ং মদনমোহন উন্মাদ, সেই মুনিমনোহরী রূপ নিয়ে যদি আপনি এই রকম যোগী ঋষির আশ্রমে যাতায়াত করেন, তা হলে নিশ্চয়ই তাদের সাধনার বিঘ্ন ঘট্‌বে।’
দুর্ব্বাসার কথায় শ্রীমতী লজ্জিত হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, — আমার অদৃষ্ট আজ বড়ই সুপ্রসন্ন যে ঋষিবর আজ ক্রুদ্ধ না হইয়া স্বাভাবিকভাবে আমার সহিত কথা কহিতেছেন। যাহা হউক তিনি বলিলেন, ‘প্রভো! আদেশ করুন; পারণের আয়োজন করি।’
দুর্ব্বাসা মৃদু হাসিয়া বলিলেন, ‘দেবী! আজ আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন; আজ আমি আপনার হতে পারণ করে ধন্য হব।’
শ্রীমতী বলিলেন, ‘দেব! আমি সমস্ত উদ্যোগ করিয়া দিই; আপনি গ্রহণ করুন।’
মুনিবর বলিলেন, ‘আপনার ও সব খাদ্য সামগ্রী আমি স্পর্শ কর্‌ব না। যদি আপনি আমার মুখে তুলে দেন ত গ্রহণ কর্‌তে পারি; না হলে নয়।’
শ্রীমতী বিষম সমস্যায় পড়িলেন। কিই বা করেন? অগত্যা স্বহস্তে পারণ করাইবেন স্বীকার করিলে মুনিবর হৃষ্টচিত্তে তাঁহার হস্তে খাইতে লাগেলেন। শ্রীমতী এক এক করিয়া মুনিবরকে সমস্ত খাওয়াইলেন। সমস্ত খাদ্যদ্রব্যগুলি নিঃশেষ হইলে দুর্ব্বাসা বলিলেন, ‘কেমন? সন্তুষ্ট হলেন ত? শ্রীমতী বিলিলেন, ‘আপনার আনন্দেই আমার আনন্দ; আপনি সন্তুষ্ট হলেই আমিও সন্তুষ্ট।’
ঋষি বলিলেন, ‘আমার সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি আমি বুঝতে পারি না; ভগবান যখন যে ভাবে রাখেন আমি সেই ভাবেই থাকি; এবং ভগবানকে ধন্যবাদ দিই।’
তখন শ্রীমতী আর কোন কথা না বলিয়া বলিলেন, ‘প্রভো! এখন অনুমতি হলে আমি গৃহে যাই।’
ঋষিবর বলিলেন, ‘আমার আবাহনও নই, বিসর্জ্জনও নেই; এখন আপনার অভিরুচি।’
শ্রীমতী গৃহাভিমুখে চলিলেন। যাইতে যাইতে মনে হইল, — আসিবার সময় শ্রীকৃষ্ণের কথায় যমুনা রাস্তা দিয়াছিল; কিন্তু যইব কিরূপে? সুতারং পুনরায় আসিয়া দুর্ব্বাসাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ঋষিবর! আমি যমুনা পার হব কেমন করে? আসাবার সময় ত শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় পার হয়েছি।’
একথার উত্তরে মুনিবর বলিলেন, ‘যাবার সময় যদি পথ না পান তাহলে যমুনাকে বল্‌বেন – ‘দুর্ব্বাসা মুনি আজ দুখানি ঘাসের রুটি ছাড়া আর কিছু না খেয়ে থাকেন আমায় পথ দাও।’ একথা বল্‌লে যমুনা অবশ্য আপনাকে পথ দেবে।’
তখন শ্রীমতী বিস্মিত দৃষ্টিতে দুর্ব্বাসার পানে চাহিলে, দুর্ব্বাসা বলিলেন, ‘ধনি! বিস্ময়ের কি আছে? সত্যই আমি দুখানি দুর্ব্বাঘাসের রুটি ছাড়া আর কিছু খাই নি।’
শ্রীমতী বলিলেন, ‘সেকি! আমি স্বহস্তে আপনাকে দুধ ক্ষীর ছানা ননী, আরও কত কি খাওয়ালুম আর আপনি এ কি বলছেন?’
তখন দুর্ব্বাসা বলিলেন, ‘হাঁ দেবি! তুমি নানাবিধ খাওয়াতে পার; কিন্তু আমার কাছে সে সব দুর্ব্বাঘাসের রুটির চেয়ে কিছু বেশী মনে হয় নি। প্রত্যহ রুটি খেয়ে যে আনন্দ পাই, ওসব খেয়ে তার চেয়ে বেশী আনন্দ পাই নি; সত্য মিথ্যা যমুনায় গিয়ে পরীক্ষা কর।’ তখন শ্রীমতী ক্ষিপ্রপদে যমুনাতীরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন এবং খরস্রোতা যমুনাকে সম্বোধন করিয়া দুর্ব্বাসার কথা বলিবামাত্র যমুনা শান্তভাব ধারণ করিয়া পথ দিলেন। শ্রীমতীও বিস্মিত কৌতুহলে ত্বরিৎপদে কৃষ্ণসকাশে উপস্থিত হইয়া আনুপূর্ব্বিক সমস্ত ঘটনা জানাইলেন। শ্রীকৃষ্ণ হাসিয়া বলিলেন, ‘দেখলে প্রিয়ে? মুনি ঋষিরা কেন অনাসক্ত! তাদের কোন কিছুতে আসক্তি নেই। অনাসক্ত অবস্থায় যাই খাওয়া হয়, তা কেবল ক্ষুধা নিবৃত্তির উপকরণ হয়ে থাকে; ভাল মন্দের বিচার তাতে আসে না। তাই শাস্ত্রে বলে, সাধুর চন্দন বিষ্ঠায় সমজ্ঞান। সুখে দুঃখে, লাভে অলাভে, জয়ে পরাজয়ে তাদের চাঞ্চল্য উপস্থিত হয় না; এ অবস্থায় অনাসক্ত হয়ে যাই খাওনা কেন তাতে ভোজন অপরাধ হয় না; অর্থাৎ সে ভোগ মিথ্যা হয়।’
এই কথা শুনিয়া শ্রীমতীর আর শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে কোনরূপ প্রশ্ন রহিল না। শ্রীকৃষ্ণ যে জাগতিক সমস্ত বিষয়ে নির্লিপ্ত এবং সকল বস্তুতে অনাসক্ত তাবা বুঝিয়া শ্রীমতী বলিলেন, ‘তবে তোমার যা কিছু ব্যাকুলতা সবই মিথ্যা?’
শ্রীকৃষ্ণ হাসিয়া বলিলেন, ‘কি রকম?’
শ্রীরাধা বলিলেন, ‘তুমি যে অহরহঃ ‘রাধা’ ‘রাধা’ বলে বাঁশী বাজাও; রাধাকে দেখ্‌বার জন্য ছুটে এস; নানা বেশে, নানা ভাবে রাধাকে দর্শন দিয়ে থাক; এসব কি মিথ্যা?’
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন, ‘না, না, মিথ্যা নয়; তবে আমার এ ব্যাকুলতা আমার জন্য নয় রাধে! তোমার জন্য; তোমাকে সুখী কর্‌বার জন্যই তোমার কাছে ছুটে আসি; যেমন দুর্ব্বাসা তোমায় তৃপ্ত কর্‌বার জন্য তোমার হাতে নানাবিধ খাদ্য গ্রহণ কর্‌লেন।’
কথা শুনিয়া লজ্জায় শ্রীমতী মাথা নত করিলেন এবং বলিলেন, ‘প্রিয়তম! তুমি কি দাসীকে এতই ভালবাস যে দাসীর সুখের জন্য দিবানিশি উন্মাদ হয়ে কত অসাধ্য সাধন করছ? ধন্য আমি! ধন্য আমার নারী জন্ম!’