মনোমুখী হয়ে না চলে গুরুর নির্দ্দেশমত চলাই নিরাপদ

বাসুদেবেষু –
পায়স খেয়ে যেমন ভাত খেতে ভাল লাগে না, তেমনি নামের আস্বাদন যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের কাছে প্রাণায়াম যোগ প্রভৃতি তুচ্ছ হয়ে যায়। যোগমার্গ ধরে যাঁরা চলেছেন, তাঁদের সাধনে একটা কঠোরতা আছে। কিন্তু নাম-সাধনে তা নাই। উপরন্তু নাম করতে করতে সাধকের হৃদয়ে এমন একটা আনন্দের অনুভূতি জেগে ওঠে যে, সে সর্ব্ব সময়ে নাম নিয়েই থাকতে চায়। অন্যান্য সাধনে সে বীতস্পৃহ হয়ে ওঠে, এমন কি অনেক কাজেও তার একটা শিথিলতা এসে পড়ে। শুধু তাই নয়। অনেক সময় সন্ধ্যা গায়ত্রী প্রভৃতি নিতেকর্ম্মগুলিও তার কাছে বাহুল্য মনে হয়। গানে আছে – ‘‘ত্রিসন্ধ্যা যে জপে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়, সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে, কভু সন্ধি নহি পায়।’’
এই প্রকার নাম-সাধক যাঁরা ‘‘সর্ব্ব ধর্ম্মান্ পরিত্যজ্য’’ শুধু নামই সার করে বসে আছেন, তাঁদের অনুসরণ করতে যাওয়া সাধারণ সাধকদের পক্ষে অনেক সময়ই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অন্তঃসলিলা ফল্গুর মত নামের যে প্রবাহ তাঁদের মধ্যে অবিচ্ছেদে প্রবাহিত হয়, সেটা সাধারণ লোকের কাছে ধরা পড়ে না। নাম-সাধকদের বাইরে ধর্ম্মের কোন অনুষ্ঠান না থাকা সত্ত্বেও সাধারণ লোকে কিন্তু তাঁদের শ্রদ্ধার চোখে না দেখেও পারে না। তাঁদের প্রভাব ও চরিত্র-বল সকলকে মুগ্ধ করে তোলে। এঁরা কোন প্রকার আনুষ্ঠানিক ধর্ম্মের আচরণ করেন না বলে, সাধারণ লোকেও তাঁদের দেখাদেখি ধর্ম্মকর্ম্ম বিসর্জ্জন দিয়ে বসে। না থাকে তাদের অন্তরে নামের ধারা, না থাকে ধর্ম্মের বাহ্য অনুষ্ঠান। কাজেই তারা দু’কুল হারিয়ে অবশভাবে কালের স্রোতে ভেসে চলে। এই সব লোকের যাতে বুদ্ধিভেদ না জন্মে, এই জন্য নিজেদের কোন প্রয়োজন না থাকলেও ধর্ম্মগুরুরা বাইরের আচার অনুষ্ঠানগুলো মেনে চলেন। শ্রীকৃষ্ণ, যিনি একজন আদর্শ ধর্ম্মগুরু ছিলেন, তাঁর নিজের কোন প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও ধর্ম্মকর্ম্মে উদাসীন ছিলেন না, এ কথা গীতায় আছে।
এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর শোন। তুমি লিখেছ, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে তোমার অবিরাম নাম চলতে থাকে বলে, অন্যান্য ধর্ম্মাঙ্গগুলোর অনু্ষ্ঠানে স্বভাবতঃই তোমার একটা শিথিলতা এসে পড়েছে, চেষ্টা সত্ত্বেও এগুলোর প্রতি তুমি আর তেমন মনযোগ দিতে পারছ না। এই কারণে এই সব আপদ চুকিয়ে দেওয়ার জন্য তুমি আমার অনুমতি চেয়েছ। আমি বলি, এত ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নাই। বর্তমানে সব সময়ে তোমার মধ্যে নামের যে প্রবাহ চলছে, এটা হয়ত সাময়িক। এখন যে অবস্থা লাভ করেছ ভেবে তুমি একটা তৃপ্তি অনুভব করছ, আমার আশঙ্কা হয়, সে অবস্থা থেকে বঞ্চিত হ’তে তোমার খুব বেশী সময় লাগবে না। সাধন গ্রহণের পর কিছুদিন পর্য্যন্ত গুরুশক্তি এমন প্রবলভাবে ক্রিয়া করতে থাকে যে, শিষ্য সাধনার এক উচ্চ স্তরে আরোহণ করেছে মনে করে একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করে; কিন্তু কিছুকাল পরে গুরুশক্তি নানা কারণে চাপা পড়ে যায় এবং পূর্ব্বাবস্থা হারিয়ে সাধক চতুর্দ্দিক অন্ধকার দেখে। শুধু তাই নয়। অনেক সময় নানাপ্রকার পাশবিক আচরণ এমন বিশ্রীভাবে তার মধ্যে প্রকট হয়ে ওঠে যে, তা’কে অতি সাধারণ মানুষের চেয়েও হীন বলে মনে হয়।
এই প্রকার অবস্থার ক্রম অল্পাধিক পরিমাণে প্রত্যেকের মধ্যে দৃষ্ট হয় এবং এর একটা বিজ্ঞান সম্মত কারণও আছে। গুরুশক্তি বা একটা বিজাতীয় শক্তি যে দেহ মধ্যে প্রবিষ্ট হয়ে ক্রিয়াশীল রয়েছে, ভোগরত বা নিদ্রাগত ইন্দ্রিয়গণ প্রথমটা তা টের পায় না। কিছুকাল পরে তারা এ বিষয়ে সচেতন হয়। তারা বুঝতে পারে যে ফেরুপালের মধ্যে বাঘ ঢুকেছে। তখন তারা একজোট হয়ে ঐ গুরুশক্তিকে কাবু করে ফেলার জন্য সর্বপ্রকার চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে দেয়। এরই নাম সাধন-সমর। মন ইন্দ্রিয় প্রভৃতি চায় জীবের উপর তাদের ভোগদখল চিরস্থায়ী করতে। এই গুরুশক্তি তাদের কবলমুক্ত করে জীবকে আত্মস্থ করতে চায়। এই গুরুশক্তি আর আত্মশক্তি – এ দুটো জিনিষ একই, কেবল নামের প্রভেদ মাত্র। সাধারণ জীবের মধ্যে আত্মশক্তি সুপ্ত অবস্তায় থাকে।
তার প্রকাশ বা অস্তিত্ব উপলব্ধির মধ্যে আসে না।
গুরুশক্তি এই আত্মশক্তিকে (যোগীরা যাকে কুলকুন্ডলিনীশক্তি বলেন) প্রবুদ্ধ করে তোলেন বলে আত্মশক্তিটাই সাধারণের কাছে গুরুশক্তি বলে প্রতিভাত হয়। যে শক্তি আমাদের মধ্যে গভীর নিদ্রামগ্ন ছিল – যার প্রকাশ, এমন কি অস্তিত্ব পর্য্যন্ত জীবের অগোচরে ছিল, গুরুশক্তি যখন হঠাৎ সে জিনিসটাকে জাগিয়ে তোলে, তখন জীব সেটাকে গুরুশক্তি বলে ধারণা করে এবং এই ভাবেই সে তার মর্য্যাদা দেয়।
পত্র দীর্ঘ হয়ে পড়েছে। এ সব প্রসঙ্গ আর একদিন উত্থাপন করবার ইচ্ছা রইল। এই যে সাধন-সমরের কথা বলছিলাম এ সংগ্রাম তোমার জীবনে এখনও আরম্ভ হয় নাই। গুরুশক্তি যে তোমার মধ্যে ক্রিয়াশীল, তা এখনও তোমার ইন্দ্রিয়াদি টের পায়নি বলে নির্বিঘ্নে নাম করা তোমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে।
এমন দিন খুব শীঘ্রই আসছে, যখন তোমার মধ্যে সাধন-সমর আরম্ভ হ’বে যখন এক দিকে তোমার দেহ ইন্দ্রিয় প্রভৃতি এবং অপর দিকে তোমার আত্মশক্তির টানা হেঁচড়ায় তুমি জর্জরিত হয়ে পড়বে। এই দুর্দ্দিনে রক্ষা পাওয়ার জন্য গুরুশক্তিকে অধিকতর শক্তিশালী করে তোলবার জন্য, ভাল না লাগলেও আনুষ্ঠানিক ধর্ম্মগুলি তোমাকে বিধিমত পালন করতে হবে; সাধন-সমরে এরা গুরুশক্তির সহায় হ’বে ব’লে এগুলির প্রয়োজনীয়তা তোমার পক্ষে খুব বেশী। অতএব মনোমুখী হয়ে না চলে গুরুর নির্দ্দেশ মত চলাই তোমার পক্ষে নিরাপদ।
আমার শরীর তদবস্থভাবেই রয়েছে। তোমরা কুশলে আছ আশা করি।
-ব্রহ্মচারী গঙ্গানন্দজী।